শব্দের সঙ্গে কৈশোর থেকেই যার নিবিড় সখ্য, কবিতা ও গল্পই যার প্রতিদিনের সঙ্গী— সেই তরুণ সাহিত্যিক হিন্দোল মিত্রের প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ সম্প্রতি প্রকাশিত হয়ে পৌঁছে গেছে পাঠকমহলে। Shobhabazar-এর এক নিম্নমধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারে জন্ম নেওয়া এই লেখক দীর্ঘদিন ধরে সাহিত্যচর্চায় নিজেকে গড়ে তুলেছেন। ইতিমধ্যেই তাঁর একটি কবিতা সংকলনও প্রকাশিত হয়েছে।
হিন্দোল মিত্রের গল্পে প্রথমেই ধরা পড়ে চরিত্রগুলির সামাজিক অবস্থান— নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনসংগ্রাম, মনের জটিল আবর্ত এবং বাস্তবতার গভীর সুর। মানবমনের অজানা রহস্যকে তিনি অন্বেষণ করেন সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে, যেখানে অন্ধকারের মধ্যেও খুঁজে পান আলোর ইঙ্গিত।
তাঁর একাধিক গল্পে ম্যাজিক রিয়ালিজমের প্রভাব সুস্পষ্ট। ‘লোভ’ গল্পে দুর্নীতির আতঙ্কে এক অফিসকর্মী বহুতলের জানালা দিয়ে উড়িয়ে দেয় কালো টাকার বৃষ্টি। অথচ সেই অনৈতিকতার বিরোধী সুব্রতই পরে অভাবের চাপে একই টাকার পেছনে ছুটতে বাধ্য হয়। বাস্তব ও অলৌকিকতার সূক্ষ্ম মিশেলে গল্পটি পাঠককে ভাবায়।
‘জয়’ গল্পে মনোজের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও স্বপ্নের ঝড় আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধারের প্রতীক হয়ে ওঠে। ‘কথা’ গল্পে জেলে সরসের মৃত্যুর পর তার ফিরে আসার সম্ভাবনা পাঠকের মনে প্রশ্ন তোলে— মৃত্যু কি সত্যিই শেষ কথা?
‘রক্ত’ গল্পে পারিবারিক দূরত্বের মাঝেও মানবিকতার গভীর অনুরণন শোনা যায়। আর ‘নরখাদক’-এ রক্তিম ও তনুশ্রীর প্রেম সমাজের বাঁধন অতিক্রম করে প্রমাণ করে— ভালোবাসা শরীরের নয়, মনের বন্ধন। ‘মুক্তি’ গল্পে হিন্দু-মুসলিম দুই পরিবারের সম্পর্কের মাধ্যমে সামাজিক সম্প্রীতির বার্তা তুলে ধরা হয়েছে।
ম্যাজিক রিয়ালিজমের ধারণা ১৯২৫ সালে জার্মান চিত্রকলায় সূচিত হয়ে পরবর্তীতে সাহিত্যে বিস্তার লাভ করে। ১৯৬৭ সালে কলম্বিয়ার সাহিত্যিক Gabriel García Márquez তাঁর নোবেলজয়ী উপন্যাস One Hundred Years of Solitude-এ এই ধারাকে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠা করেন। সেই ঐতিহ্যের এক স্বতন্ত্র বাংলা রূপ খুঁজে পাওয়া যায় হিন্দোল মিত্রের লেখনীতে।
বৈচিত্র্যময় চরিত্রচিত্রণ, সূক্ষ্ম বর্ণনাশৈলী এবং গভীর মানবিক অনুভূতির সমন্বয়ে হিন্দোল মিত্র নিজেকে এক সক্ষম গল্পকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর এই গ্রন্থ কেবল গল্পের সংকলন নয়— এটি বাস্তব ও জাদুবাস্তবতার সংযোগসেতু, মানবমনের অনুসন্ধান এবং ভালোবাসার নিরবচ্ছিন্ন জয়গান।

