২৭ বছর বয়সী এক তরুণী প্রস্রাব করতে না পারা এবং তলপেটে অস্বস্তির অভিযোগ নিয়ে মেডিসিন বিভাগের কনসালট্যান্ট ডা. মানালি ভট্টাচার্য এবং সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিভাগের প্রধান ডা. রিমিতা দে–এর তত্ত্বাবধানে হাসপাতালে ভর্তি হন। রোগীর পূর্ব ইতিহাসে ছিল পলিসেরোসাইটিস, যা একটি গুরুতর প্রদাহজনিত অবস্থা, যেখানে হৃদপিণ্ড, ফুসফুস ও উদরের মতো দেহগহ্বরের আবরণী ঝিল্লিগুলিতে প্রদাহ সৃষ্টি হয়ে অতিরিক্ত তরল জমা হয়।
প্রাথমিক মূল্যায়নে এটি ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (ইউটিআই) বলে সন্দেহ করা হয়। কিন্তু ভোররাতে হঠাৎই রোগীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। অত্যন্ত নিম্ন রক্তচাপ ও শ্বাসকষ্ট দেখা দেওয়ায় তাঁকে তৎক্ষণাৎ আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। পূর্ববর্তী পলিসেরোসাইটিসের ইতিহাসের কথা মাথায় রেখে পরিবারের সদস্যদের পরিস্থিতির গুরুত্ব সম্পর্কে অবহিত করা হয়।
আইসিইউতে ভর্তি হওয়ার পর রোগীর জীবন-মরণ লড়াই শুরু হয়। তাঁর ফুসফুসে দ্রুত তরল জমতে থাকে, যেন নলকূপে জল ভরছে। ক্রিটিক্যাল কেয়ার ও ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের বিশেষজ্ঞরা নিরলসভাবে রোগের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে যুক্ত হন। পরিবারের সদস্যরা শেষ আশাটুকু আঁকড়ে ধরে চিকিৎসকদের উপর সম্পূর্ণ আস্থা রাখেন, যা চিকিৎসা প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।
একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হলেও প্রাথমিকভাবে রিপোর্টগুলি স্পষ্ট কোনও দিশা দিতে পারেনি। ক্রমবর্ধমান হাইপোক্সিয়া (রক্তে অক্সিজেনের ঘাটতি), ট্যাকিকার্ডিয়া (হৃদস্পন্দনের গতি বেড়ে যাওয়া) এবং ট্যাকিপনিয়া (অস্বাভাবিক দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাস)–এর কারণে রোগীকে হাই-ফ্লো নেজাল অক্সিজেনে রাখা হয়। মাল্টি-ডিসিপ্লিনারি টিম (এমডিটি) বৈঠকের মাধ্যমে প্রতিটি সম্ভাব্য ক্লিনিক্যাল পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হয় এবং নির্ধারিত চিকিৎসা প্রোটোকল অনুসরণ করা হয়।
অবশেষে চিকিৎসকরা সিদ্ধান্তে পৌঁছন যে রোগী সাইটোকাইন স্টর্ম–এর শিকার হয়েছেন। এটি একটি মারাত্মক ও প্রাণঘাতী ইমিউন প্রতিক্রিয়া, যেখানে শরীর অত্যধিক পরিমাণে প্রদাহজনিত সিগন্যালিং প্রোটিন বা সাইটোকাইন নিঃসৃত করে। এই অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়ার ফলে রক্তনালিতে লিকেজ সৃষ্টি হয় এবং সেই কারণেই রোগীর ফুসফুসে প্রচুর তরল জমা হয়।
পরবর্তীতে প্লুরাল ফ্লুইড ট্যাপিং এবং সাইটোসর্ব অ্যাবসর্পশন থেরাপি (রক্ত থেকে অতিরিক্ত প্রদাহজনিত উপাদান ও টক্সিন অপসারণের একটি বিশেষ চিকিৎসা পদ্ধতি) প্রয়োগের পর রোগীর শারীরিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটে। তাঁর শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক হয় এবং রক্তচাপ স্থিতিশীল হয়ে ওঠে। এরপর তাঁকে আইসিইউ থেকে জেনারেল ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয় এবং আরও ৪৮ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রাখা হয়।
অবশেষে সুস্থতার পথে এগিয়ে রোগীকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরিবারের প্রার্থনা সফল হয় এবং জীবনের প্রতি অগাধ ভালোবাসা থাকা তাঁদের প্রিয়জন নিরাপদে বাড়ি ফিরে যান। এই ঘটনা আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের জটিলতা, চিকিৎসকদের অধ্যবসায়, সমন্বিত দলগত প্রচেষ্টা এবং রোগীর পরিবারের অটুট বিশ্বাসের এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে রইল।

